শীতের সময়ে কিভাবে যত্ন নিবেন (How to take care during the winter)

ছয় ঋতুর দেশ বাংলাদেশ। ছয় ঋতুর মধ্যে সবথেকে শীতলতম এবং জনপ্রিয় ঋতুর নাম হলো শীতকাল।

শীতকালের পরিবেশটাই অন্যরকম। বিশেষ করে শীতের সকাল ঘন কুয়াশায় ঘেরা শীতের সকাল দেখলে মনে হয় যেন প্রকৃতি তার গায়ে সাদা চাদর জড়িয়ে আছে। মুক্ত স্বাধীন পাখিদের দল ও পাখামেলে উড়ে বেড়ানোর থেকে গুটিসুটি মেরে ঝিমাতে বেশি পছন্দ করে এই ঋতুতে। শীতের আবহাওয়া খুবই শুষ্ক ও রুক্ষ। এইসময় নানান রকম অসুখবিসুখের প্রবণতা হুট করে বেড়ে যায় সেইসাথে শরীরের ত্বক তার স্বাভাবিক সৌন্দর্য্য প্রানবন্ততা হারায়।

শীত জিনিসটা আসলে কি? কেন আমাদের শীত অনুভূত হয়?

মানুষের শরীরের রক্ত উষ্ণ, উষ্ণতা সবসময় তার শরীরে সক্রিয়ভাবে বিরাজ করে। মানুষের দেহের তাপমাত্রা সবসময়ই শীতলের বিপরীত উষ্ণভাব থাকে। কিন্তু, শীতকালে মানুষের দেহ স্বাভাবিকের তুলনায় অনেকটাই উষ্ণ তাপ হারায়,তখন শরীরে শীতলতা বিরাজ করে এবং উষ্ণতার বিপরীতে শীতলতা অনুভব করি,আর অনুভব করাকেই শীত বলে অথবা শীত লাগে। বিশেষজ্ঞ দের মতে অন্যান্য ঋতুর চেয়ে শীতে আমাদের ত্বকের বিশেষ বাড়তি যত্ন প্রয়োজন।
শীতে সদ্য জন্ম নেওয়া নবজাতক শিশু থেকে শুরু করে প্রবীণ বৃদ্ধের ও বিশেষ যত্ন আবশ্যক ভাবে জরুরী।

শীতে পরিবেশের তাপমাত্রা

অনেক বেশি ওঠানামা করে স্বাভাবিক সময়ের থেকে। এবং এই তাপমাত্রা উঠানামার ভারসাম্যর তারতম্যতা খাপ খাওয়াতে মানবদেহের স্বাভাবিক পিএইচ, তাপমাত্রা, হরমোন, এনজাইমের কার্যক্রমকে নষ্ট করে বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে।রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় প্রবীণরা বেশি ঝুঁকিতে থাকে। তাই শীতে বাড়তি সতর্কতা মেনে চলা জরুরী।

শিশুদের শীতের সুরক্ষা

শীতে শিশুর ত্বকের যত্নঃ

    • শিশুদের ত্বক বড়দের তুলনায় অনেক বেশি নমনীয় কোমল। শীতে শিশুর ত্বক ও শুষ্কতা বিরাজ করে।
      কিন্তু শুষ্কতা কমাতে ঘনঘন লোশন তেল ব্যবহার না করে,জলপাই তেল/অলিভ অয়েল দেওয়াটা জরুরী। অলিভ অয়েল শুধু ময়েশ্চারাইজারের কাজই করে না।
    • সেইসাথে ত্বকে একটা পুষ্টি জোগায়।
    • বেবিসোপ বা অন্যান্য সাবান ব্যবহার না করে শিশুর ত্বকের জন্য গ্লিসারিন যুক্ত সাবান দিয়ে গোসল করানো উচিত। এতে ত্বক ও থাকে ভালো প্রানবন্ত।
    • সুতি পোশাক পরানো উচিত শিশুকে শীতের পোশাকের পাশাপাশি।
    • ঠান্ডা পানি পরিহার করা এবং একই সাথে অতিরিক্ত গরম পানি দিয়ে গোসল করানো থেকে বিরত থাকা।
      হালকা কুসুম গরম পানিতে শিশুকে গোসল করানো উত্তম।
    • জামাকাপড় সাবান দিয়ে না ধুয়ে স্যাভলন দিয়ে নিয়মিত পরিষ্কার করা। কেননা, সাবানের ক্ষারযুক্ত শুকনো কড়কড়ে কাপড় শিশুর নরম ত্বকের ক্ষতিই শুধু করে না সেইসাথে অস্তিত্বকর অনুভূতি তৈরী করে।
      এবং রোগ জীবাণু ধব্বংস হয় না।
    • সকালের রোদ ভিটামিন ডি এর কাজ করে তাই শিশুকে শীতের সকালে কিছুটা রোদে রাখা উচিত।
      এতে তার শরীরে ভিটামিন ডি উৎপন্ন হয় যা হাড় শক্ত ও মজবুত করে।
  • আরো কিছু :

    • সরিষার তেল ব্যবহার না করা। অনেকেই শিশুকে সরিষার তেল মাখিয়ে থাকেন যা প্রচলিত একটা ভুল নিয়ম এবং শিশুর ত্বক ও শিশুর জন্য খুবই ক্ষতিকারক।
      সরিষার তেল নাকের মাধ্যমে শ্বাসনালিতে ঢুকে গিয়ে শিশুদের মারাত্মক ধরনের নিউমোনিয়ার ঝুঁকি ও হতে পারে।
    • পুষ্টিকর খাবারের দিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া। শীতকালীন ফলমূল সবজি খাওয়ানো এতে শরীরে পুষ্টির ঘাটতি দূর করবে এবং শিশুর বিকাশ বৃদ্ধি স্বাভাবিক থাকবে।

এছাড়া ও শিশুর ক্ষেত্রে বাড়তি সকল যত্ন ও মনোযোগ দরকার।

শীতে শিশুর নিউমোনিয়া ঝুঁকি থাকে শ্বাসকষ্টর ভুক্তভোগী ও শিশুরা বেশি হয় সুতরাং শিশুর যত্নে মনোযোগী হওয়া জরুরী।শীতকালে শিশুদের পরে সব থেকে বেশি ভুক্তভোগী যারা হয় তারা হলো প্রবীণ বৃদ্ধ মানুষ গুলো। প্রবীণ বৃদ্ধরা বয়সের কারণে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হারায়।

এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় যেকোনো রোগে খুব সহজে আক্রান্ত হয়। শীতের এই শুষ্ক আবহাওয়া প্রবীণ বৃদ্ধদের জন্য ক্ষতিকারক যদি কেউ সতর্কতা মেনে না চলে।

প্রবীন্দের সুরক্ষা

শীতে প্রবীণ বৃদ্ধদের যত্নঃ

  • বয়স্কদের হাত পা ত্বকের যত্নে ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা। শীতের শুষ্কতা আদ্রতার ফলে পা ফেটে যাওয়ার প্রবণতা বয়স্কদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। সুতরাং হাত পায়ে ময়েশ্চারাইজার লোশন ক্রিম ব্যবহার করা।
  • শীতের পোশাক পরিধান করা। অতিরিক্ত টাইট আটসাট পোশাক এড়িয়ে চলা। অতিরিক্ত আটসাট পোশাক শরীরের স্বাভাবিক রক্তচলাচলে বাধা সৃষ্টি করে ফলে শ্বাসকষ্ট ও হার্ট অ্যাটাক হবার তীব্র সম্ভাবনা থাকে।
  • প্রচুর শাকসবজি ফলমূল খাওয়া। সুস্থ থাকতে পুষ্টিকর খাবারের বিকল্প নেই।
  • কুসুম গরম পানি পান করা। ঠান্ডা জাতীয় খাবার এড়িয়ে চলা।
  • ঠান্ডা পানি দিয়ে গোসল না করা
  • সবসময় শুয়ে বসে না থেকে হাটাচলা করা এতে শরীরে রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক থাকে। শীতের সকালের রোদ শিশুদের পাশাপাশি
    প্রবীণদের জন্য ও জরুরী। তাই শীতের সকালে ১০ থেকে ১৫মিনিট রোদে বসে থাকা।
  • পর্যাপ্ত পানি পান করা। শীতে অনেকেই পানি পান থেকে বিরত থাকে।যা স্বাস্থ্যর জন্য মারাত্মক ঝুঁকি ও ক্ষতিকারক।
  • পর্যাপ্ত ঘুম। বিশেষ করে বেশি রাত না জেগে থাকা।
  • সবসময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকা এতে শীতকালীন চর্মরোগ থেকে রেহাই পাওয়া যায়।
  • ঠান্ডা কাশি জ্বর হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া।

এছাড়াও সকল ধরনের স্বাস্থ্যগত যত্ন,সতর্কতা মেনে চলা ভীষণভাবে জরুরী।

শীতকালীন সমস্যা :

শীতকালীন বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হতে শুধু কিন্তু শিশু আর প্রবীণরায় হয় তাই নয়। যুবক যুবতী এবং মধ্যবয়সী মানুষগুলোও রীতিমতো বিভিন্ন ঝক্কিঝামেলাতে পড়ে। এবং শীতে তাদের ও ত্বক ও স্বাস্থ্যগত দিকে বিশেষভাবে নজর দেওয়া জরুরী।

শীতে বাতাসের আদ্রতা আবহাওয়া প্রচুর শুষ্কতা বিরাজ করে। এইসময়ের রাস্তাঘাটের ধুলাবালি ও বিপদজনক।

শীতে সব থেকে বেশি আমাদের শরীরে যে জিনিসটি ভুক্তভোগী হয় তাহলো আমাদের ত্বক। ত্বক তার স্বাভাবিক রুপ হারায়।
একটা খসখসে শুষ্কভাব ত্বকের স্বাভাবিক সৌন্দর্য্য নষ্ট করে সেইসাথে দেয় অস্বস্তিকর অনুভূতি।

ত্বকের যত্ন

শীতে ত্বকের বিশেষ যত্নঃ

১.ঠোঁটঃ ঠোঁট আমাদের শরীরের সব থেকে কোমল অংশ। শীতের আদ্রতায় আমাদের ঠোঁট হয়ে ওঠে রুক্ষ শুষ্ক এমনকি অনেকসময় ঠোঁট ফেটে যাওয়ার প্রবণতা ও দেখা যায়। তাই আমাদের উচিত ঠোঁট এর বিশেষ যত্ন নেওয়া। গ্লিসারিন যুক্ত ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা। অথবা লিপবাম দিয়ে সবসময় ঠোটকে কোমল রাখা। ভিটামিন সি যুক্ত খাবার খাওয়া।

২.পায়ের যত্নঃ শীতে পা ফাটার প্রবণতা অনেক বেশি দেখা যায়। সুতরাং শীতে পায়ের যত্ন এড়িয়ে চলা ঠিক নয়। সবসময় পা কুসুম গরম পানি দিয়ে পরিষ্কার করে ধুয়ে ময়েশ্চারাইজার লাগানো। পায়ের মোজা পরিধান করা জরুরী। পায়ের নখ কাটা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা। সেইসাথে পায়ে ব্যবহৃত জুতা স্যান্ডেল ও পরিষ্কার রাখা।

৩.মুখের যত্নঃ আমরা জানি আমাদের মুখের ত্বক শরীরের আর সব চামড়া থেকে তিনগুন কোমল। আর শুষ্ক শীতল আবহাওয়ার সব থেকে বেশি প্রভাব পড়ে আমাদের মুখের কোমল ত্বকে।

মুখের যত্নে সবসময় সতর্কতা জরুরী। পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুয়ে ময়েশ্চারাইজার লাগানো উচিত নিয়ম করে। কেননা অতিরিক্ত শীতে মুখের চামড়া ফেটে লাল হয়ে যেতে পারে।

৪.চুলের যত্নঃ শীতকালের ধুলাবালি ও মারাত্মক ক্ষতিকারক। শীতের ধুলাবালি শুধু আমাদের ত্বককেই ক্ষতি করে না সেইসাথে আমাদের চুলের আদ্রতা ও স্বাভাবিক সৌন্দর্য্য নষ্ট করে। চুলে খুশকি চুল পড়ার প্রবণতাও বৃদ্ধি পায়।

সুতরাং ত্বকের যত্নের পাশাপাশি চুলের ও যত্ন প্রয়োজন। নিয়মিত শ্যাম্পু করা,তেল দেওয়া,চুলে চিরুনি করা এইসময় বেশি দরকার। এতে চুল তার স্বাভাবিক ভারসাম্যর সৌন্দর্য্য ফিরে পায়।

৫.চোখের যত্নঃ

আমাদের চোখ আমাদের সৌন্দর্য্য বহন করে। চোখ কে বলা হয় সৌন্দর্য্যের প্রতিক। শীতকালে চোখে এক ধরনের ভাইরাসের প্রবণতা অনেক বেশি দেখা যায়। তাই আমাদের চোখের যত্নে সতর্কতা দরকার। নিয়মিত ঘুম থেকে উঠে চোখ পরিষ্কার করা। অতিরিক্ত নিদ্রাহীন না থাকা। চোখের কোনা সহ চোখের পাপড়ি পর্যন্ত পরিষ্কার রাখা। ভিটামিন এ যুক্ত খাবার খাওয়া।

বাইরের ধুলাবালি থেকে এসে হাত পা মুখ ধোবার পাশাপাশি চোখকেও সুন্দর করে পরিষ্কার করা। মাঝেমধ্যে দুই হাতের তালু দিয়ে চোখকে দুই তিন মিনিট ঢেকে রাখা এটা চোখের ব্যায়াম হিসাবে দারুন কাজ করে।

এছাড়া ও শীতে পর্যাপ্ত ফলমূল শাকসবজি খাওয়া,পর্যাপ্ত পানি পান করা। শীতের পোশাক পরিধান করা,গরম পানি ব্যবহার করা,হাত পায়ে মোজা পরিধান করা,ডাক্তারি পরামর্শ ও স্বাস্থ্যগত সুরক্ষা মেনে চলা উচিত সকল বয়সী মানুষের জন্য।

আমাদের সচেতনাতায় আমাদের দিতে পারে একটা সুন্দর জীবন একটা সুন্দর পরিবেশ। শীত কে ভয় নয় বরং শীতকে উপভোগ করুন আপনার সকল সচেতনতা এর মাধ্যমে।

Leave a Comment