নারীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা (WOMEN’S HEALTH PROTECTIONS)

সৃষ্টিজগৎ এর সকল সৃষ্টির মধ্যে এক রহস্যময় সৃষ্টির নাম হলো নারী।

নারীরা বড্ডবেশিই রহস্যময়ী। নারীর স্বাস্থ্য রক্ষাও তাই পুরুষের চেয়ে ভিন্ন। নারী কখনো পরম মমতাময়ী, কখনো কঠিন ব্রত পালনের মতো কঠোর,কখনো সে প্রচুর অভিমানী আবার কখনো সবথেকে বড় সংগ্রামী ও ত্যাগী।

নারীদের এই রহস্য উদঘাটনে বিশেষজ্ঞরা লাগাতর কাজ করেও সঠিক রহস্য উদঘাটনের কোন পরিপূর্ণ তত্ব খুঁজে পায়নি। হয়তোবা এরজন্যই নারীরা রহস্যময়ী। একজন নারী জন্মের পরেই নারী হয়ে উঠেনা।

নারীর স্বাস্থ্য

 নারীর জীবনের শুরুর সময়টা :

তাকে পার করতে হয় অনেকগুলো স্টেজ। যেতে হয় অনেক প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে শৈশবের পর
কৈশোর সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ এই সময়টাকে বয়ঃসন্ধিকাল বলা হয়।

বয়ঃসন্ধিকাল ছেলে ও মেয়ে উভয়ের শরীর ও মনে নানা ধরণের পরিবর্তন ঘটে। কিন্তু, এ সময়ে ছেলেদের থেকে বেশি মানসিক চিন্তার ব্যাপক পরিবর্তন দেখা যায় একজন মেয়ের মধ্যে।

এছাড়াও চিকিৎসকদের মতে মেয়েদের বয়ঃসন্ধিকাল, ছেলেদের চাইতে কিছুটা আগে শুরু হয়। মূলত ১০ থেকে ১৩ বছরের মধ্যে যেকোনো সময় তা হতে পারে। মেয়েদের ১২ থেকে ১৩ বছরের মধ্যে সবথেকে বড় যে পরিবর্তনটা আসে তা হলো পিরিয়ড।

নারীর স্বাস্থ্য

বয়সন্ধিকালের সমস্যা এবং সমাধান :

একটি মেয়ে পরিপূর্ণ নারী হয়ে ওঠে তার পিরিয়ড বা মাসিকের মাধ্যমে। তবে আমাদের সমাজে পিরিয়ড বা মাসিক শব্দগুলোকে লজ্জা ও বিব্রতকর সেইসাথে সংকোচের বিষয় ভাবা হয়।

ফলে একজন মেয়ে তার জীবনে হঠাৎ আকস্মিক পরিবর্তন নিয়ে কারোর সাথে মন খুলে কথা বলতে পারে না। একটা ভয় একটা লজ্জা একটা সংশয় সারাক্ষণ তাকে মানসিকভাবে তাড়া করে বেড়ায় যা খুবই ভয়ানকভাবে প্রভাব ফেলে তার উপরে।

এছাড়াও বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য এবং পিরিয়ড বা মাসিকের সময়ে পরিচ্ছন্নতা বা নিরাপদ ব্যবস্থাপনা না থাকায় বেশিরভাগ নারীরা নানা রোগে ভুগে। যা পরবর্তীতে জটিল রোগ হবার তীব্র সম্ভাবনা আছে।

পিরিয়ডের শুরুর আগে এস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায় ফলে মেয়েদের মানসিক অবস্থার এক বিশাল পরিবর্তন দেখা যায়। এবং তাকে সাইকোলজিতে মুড সুইং বলা হয়। অধিকাংশ নারীর ক্ষেত্রে মুড সুইং দুই থেকে তিনদিন বিরাজ করে পিরিয়ড চলাকালীন।

কিন্তু,কিছু সংখ্যক নারী গুরুতর ভাবে এই সমস্যার মুখোমুখি হয় যা অনেক ক্ষেত্রে তাদের মানসিক স্বস্তি স্থায়ীভাবে নষ্ট করে। অনেকে এর ফলে মারাত্মক হতাশা, সব সময় মেজাজ খিটমিট করা, রাগারাগি করার মতো সমস্যায় ভুগে থাকেন।

এছাড়া এ সময়ে খাওয়াদাওয়াতেও একটা অরুচি ভাব জন্মায়। অনেকে স্যানেটারি ন্যাপকিনের বদলে কাপড় ব্যবহার করে থাকেন ফলে মানসিক অস্বস্তির সাথে জরায়ু ক্যান্সার হওয়ার সম্ভবনা ও আছে।

নারীর স্বাস্থ্য

পিরিয়ড এবং নারী :

সুতরাং পিরিয়ড চলাকালীন একজন নারীর স্বাস্থ্য সুরক্ষা সব থেকে বেশী জরুরী বলা যেতে পারে শতভাগ জরুরী। এইসময় নারীদের প্রচুর পুষ্টিকর খাবার,পর্যাপ্ত বিশ্রাম ঘুম,স্যানেটারি ন্যাপকিন ব্যবহার এর বিশেষ প্রয়োজন।

শুধু তাই নয় সেইসাথে নারীদের এইসময়ে পরিবার পরিজন তাদের থেকে দূরে না থেকে মানসিক সাপোর্ট দেওয়া জরুরী। এতে ভয়,সংকোচ, নেতিবাচক ভাবনা দূর হয়ে মানসিক অস্বস্তি ও কমে যায়।

যার ফলে সে একটা স্বাভাবিক চিন্তাচেতনায় ফিরতে পারে।

নারীর স্বাস্থ্য সুরক্ষার দিকে দৃষ্টি দিলে সবথেকে বড় যে সমস্যার চিত্রপটটি আমাদের সামনে ভেসে ওঠে তাহলো অপুষ্টি! অপুষ্টির শিকারের ভুক্তভোগী পুরুষদের থেকে নারীরা বেশি।

নারীর স্বাস্থ্য

অপুষ্টির অভাবে নারী বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হয় যেমন:

  • গর্ভের সন্তান প্রতিবন্ধী অপুষ্টির শিকার হওয়া।
  • পরিপূর্ণ পুষ্টির অভাবে সন্তান প্রসবে মারা যাচ্ছে অনেক নারী।
  • পুষ্টির অভাবে নারীদের ভঙুর দৈহিক ঘটন বেড়ে ওঠা।
  • অপুষ্টির শিকারের কারণে নারীদের মাথার চুল পড়া।
  • অপুষ্টির অভাবে ভিটামিন সি এর বিশাল ঘাটতি ফলে মুখে ঘা,জিহব্বাতে ঘা, এমনকি খাদ্যভাসে তীব্র অরুচি সৃষ্টি হওয়া।
  • চর্মরোগ এবং ব্রণ সমস্যায় ভোগা।
  • মানসিক অশান্তি স্থায়ীভাবে বিরাজ করা।
  • রক্তস্বল্পতা ও ভিটামিন ক্যালসিয়ামের ঘাটতি।
  • রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া।
  • নিদ্রাহীনতায় ভোগা।

ইত্যাদি আরো কঠিন জটিলতাময় সমস্যার সম্মুখীন হওয়া।

নারীর স্বাস্থ্য

সুস্থ থাকতে পুষ্টিকর খাবারের বিকল্প নেই। নারীর স্বাস্থ্য সুরক্ষা অটুট রাখতে তার খাবারের তালিকায় অবশ্যই সুষম খাদ্যে রাখা জরুরী। এছাড়া পর্যাপ্ত পানি পান করার অভ্যাস করা উচিত।

পানি শরীরের ত্বককে সজীব ও প্রানবন্ত রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে।পুষ্টিকর খাবারের পাশাপাশি নারীকে অবশ্যই ঘুমের দিকেও যথেষ্ট খেয়াল রাখতে হবে কারণ সুস্থ থাকার প্রধান শর্তগুলোর মধ্যে ঘুম ও আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রয়েছে।

একটা ফ্রেশ ঘুম আপনাকে শুধু স্বাস্থ্য সচেতনতার দিকেই পরিপূর্ণ করবে না বরং তার পাশাপাশি আপনার মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষকেও আরাম দেবে। অন্তত স্নায়ুযুদ্ধের চাপ কমাবে খুব সহজে।

নারীর স্বাস্থ্য সুরক্ষার সাথে মানসিক অবস্থা খুব শক্ত ও মৌলিকভাবে জড়িত।

প্রতিটি নারীর উচিত অন্তত তিন মাস পর পর হলেও মানসিক ডাক্তার দেখানো। কিন্তু মানসিক ডাক্তার দেখানো দূরে থাক আমাদের সমাজে মানসিক রোগ, মানসিক চিকিৎসা, মানসিক ডাক্তার নাম শুনলেই সবাই কেমন বাঁকা চোখে তাকায় এবং একবাক্যেতে বলে দেয় পাগলের চিকিৎসা, পাগলের ডাক্তার।

যা প্রচলিত একটা ভুল ধারণায় নয় শুধু সেইসাথে একটা প্রাচীন কুসংস্কার ও। মানসিক চিকিৎসা নেওয়া বা মানসিক ডাক্তার দেখানোর মানে এই নয় যে সে পাগল হয়ে গেছে। মানসিক রোগের ডাক্তার মানে পাগলের ডাক্তার নয় বরং মনের ডাক্তার।

শরীর সুস্থ রাখতে যেমন ডাক্তারের পরামর্শ ডাক্তার দেখানো প্রয়োজন ঠিক তেমনই মনের জন্যে ও মনের ডাক্তার বিশেষভাবে প্রয়োজন।

মানসিক রোগের সব রকম ভয়ানক জটিলতার স্টেজ গুলোর ভিক্টিম নারীরা হয়। নারীর মনের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চেপে রাখা অনুভূতি একসময় ডিপ্রেশনের শহর গড়ে তোলে মস্তিষ্কে যা কখনো কখনো হ্যালুসিনেশনের পর্যায়ে নিয়ে যায়।

সুতরাং নারীর স্বাস্থ্য সুরক্ষাতে মানসিক চিকিৎসা আবশ্যক। বর্তমান নারীর স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে সব থেকে ভয়াবহ যে নামটি মিশে আছে তা হলো ব্রেস্ট ক্যান্সার। এই নামটি বর্তমান নারীর জন্য সব থেকে ভয়ানক শব্দ।

নারীর স্বাস্থ্য

ব্রেস্ট ক্যান্সার মুলত কি?

নারীর স্তনে কিছু কোষ যখন অতিরিক্ত ভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে,এবং অতিরিক্ত বৃদ্ধি পাওয়া কোষগুলো বিভাজনের মাধ্যমে টিউমার বা পিণ্ডে রুপান্তর হয়ে রক্তনালীর লসিকা (কোষ-রস) ও অন্যান্য মাধ্যমে স্তনজুড়ে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে এবং এই তীব্রভাবে ছড়িয়ে পড়াকেই ব্রেস্ট ক্যান্সার বলা হয়।

ব্রেস্ট ক্যান্সার কেন হয়?

বিশেষজ্ঞদের মতে ব্রেস্ট ক্যান্সার হওয়ার পিছনে মৌলিক যে কারণ দ্বায়ী তাহলো আমাদের দৈন্দিন জীবনে খাদ্যভাসের পরিবর্তন। যেখানে প্রচুর ফলমুল শাকসবজি খাওয়ার কথা সেখানে অতিরিক্ত ফাস্টফুড রাখা হচ্ছে।

সুষমের খাদ্যের পরিবর্তে অতিরিক্ত মুখরোচক তেলচর্বি জাতীয় খাবার খাবারের তালিকায় রাখা একটা উল্লেখযোগ্য কারণ বলে মনে করে থাকেন বিশেষজ্ঞরা।

অনিয়মিত পিরিয়ড বা দীর্ঘবছর ধরে পিরিয়ড বা মেনোপজ বন্ধ থাকে তাহলে তার ও ব্রেস্ট ক্যান্সারের ঝুঁকি থাকতে পারে। পরিবার বা বংশীয়গত ভাবে কারোর ব্রেস্ট ক্যান্সার থাকলে।

একাধারে একটানা জন্ম নিয়ন্ত্রণ পিল খাওয়া হরমোনের ইঞ্জেকশন নেওয়া কারণে ও ব্রেস্ট ক্যান্সারের ঝুঁকি আছে। অনেক দেরীতে সন্তান নেওয়া।

সন্তানকে পর্যাপ্ত বুকের দুধ না খাওয়ানোর ফলে স্তনে ওজন বৃদ্ধি পেয়ে অতিরিক্ত কোষগঠন করে ব্রেস্ট ক্যান্সার ঘটতে পারে। অতিরিক্ত আটসাট পোশাক পরিধান করা হয়। যার কারনে ব্রেস্টে একটা চাপ সৃষ্টি হয় ফলে রক্তচলাচল তার স্বাভাবিক গতি হারায়।

এবং ব্রেস্ট ক্যান্সারের ঝুঁকির দিকে একধাপ এগিয়ে নিয়ে যায়।

নারীর স্বাস্থ্য

ব্রেস্ট ক্যান্সার এর লক্ষণ কি কি?

  • স্তনে গোল চাকার মত ঘা দেখতে পাওয়া।
  • বোটা ভিতরে ঢুকে যাওয়ার অবস্থা হওয়া। বোটার অস্বাভাবিক পরিবর্তন বাকা হয়ে যাওয়া। স্তনের বোটায় ব্যাথা অনুভব হওয়া।
  •  তরল পর্দাথের মতো একধরনের পানি অথবা রস বের হওয়া স্তনের বোঁটা দিয়ে।
  • চামড়ার রং আকস্মিক পরিবর্তন ঘটলে স্তনের।
  •  মাংসপিণ্ড এ অস্বাভাবিক যন্ত্রনা সৃষ্টি হলে।

ব্রেস্ট ক্যান্সারের চিকিৎসা :

বিশেষজ্ঞদের মতে ব্রেস্ট ক্যান্সার প্রথম স্টেজে ধরা পড়লে সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে রোগীর সুস্থ হবার সম্ভাবনা রয়েছে।

কিন্তু আমাদের সমাজের দিকে লক্ষ করলে দেখা যায় এই রোগটাকে লজ্জাজনক হিসেবে দেখা ও উপস্থাপন করা হয়।

নারীর স্বাস্থ্য

আরো কিছু সমস্যা

এছাড়া অধিকাংশ নারীরা এই রোগ সম্পর্কে সচেতনই নয়। ব্রেস্ট ক্যান্সারে অসংখ্য নারী প্রতিনিয়ত বিশ্বে মারা যাচ্ছে। ব্রেস্ট ক্যান্সার নারীর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় মৌলিক অংশগুলোর মধ্য একটি। নারীর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অবশ্যই নারীর উচিত তার ব্রেস্ট পরীক্ষা করে দেখা কোন অস্বাভাবিক লক্ষণ আছে কি না।

লজ্জা, ভয়,সংশয়ের থেকেও বেশি জরুরী সুস্থ থাকা সুন্দর থাকা।নারীর স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে ব্রেস্ট ক্যান্সার তীব্র নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সুতরাং স্বাস্থ্য সুরক্ষা সুনিশ্চিত করতে হবে।

নিজের প্রতি নিতে হবে যত্ন

একজন নারীকে অবশ্যই ব্রেস্ট ক্যান্সার সম্পর্কে উদাসীনতা নয় বরং সচেতনতার দিকে বিশেষ যত্ন ও মনোযোগ দেওয়াটা আবশ্যক। নারীর স্বাস্থ্য সুরক্ষাতে হাসিখুশি প্রাণবন্ত থাকাও বিশেষভাবে প্রয়োজন। হাসিখুশি থাকলে স্নায়ুচাপ কমে মন প্রফুল্ল হয়।

এছাড়া হাসিখুশি আনন্দে থাকা ব্যক্তির হৃদরোগের সম্ভাবনা কম থাকে। নারীর স্বাস্থ্য সুরক্ষা অটুট রাখতে নারীর নিজের সম্পর্কে যত্নশীল সচেতনতার বিকল্প নেই।

স্বাস্থ্য সুরক্ষা শুধু দৈহিক ভাবেই নয় বরং মানসিকভাবেও একজন নারীকে জীবন যুদ্ধে আত্মসংযামী হিসেবে গড়ে তুলে।

Leave a Comment